বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

Dec 2, 2011 at 10:23 pm in ব্লগ by সোহাগ যাদু

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর৩০ লাখ মানুষ হারানোর দুঃসহ কষ্টের বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। বাঙালী জাতির একটি নিজস্ব রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাস ডিসেম্বর। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তার এ দেশীয় দোসরদের পরাস্ত করার মাস ডিসেম্বর। একাত্তরের রক্তঝরা এদিনে চলমান যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে রাশিয়া তৃতীয় বারের মতো ভেটো দেয়। রাশিয়ার ভেটোতে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নাকচ হয়ে না গেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন আরও দেরিতে হতো। ১৯৭১ সালের এই দিন দেশের বেশিরভাগ এলাকা শত্রুমুক্ত হয়। পাকিস্তানী বাহিনীকে পরাস্ত করে ঢাকা দখলের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে এগুচ্ছে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধারা। বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়ায় বীর বাঙালী। বাংলাদেশ নামক দেশের অভ্যুত্থান ঠেকাতে না পেরে বাঙালী জাতিকে নেতৃত্ব ও মেধাশূন্য করতে পাকিস্তানী বাহিনী তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরদের নিয়ে ঘৃণ্য ও বর্বর ষড়যন্ত্র চালানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে থাকে। চালাতে থাকে শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে নিষ্ঠুর ও নির্মম কায়দায় হত্যাযজ্ঞ।এদিনে উত্তর দিক থেকে জেনারেল নাগরার বাহিনী ও কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা সন্ধ্যায় পাকিস্তানী হানদার বাহিনীর হাল্কা প্রতিরোধ ব্যর্থ করে কালিয়াকৈর পর্যন্ত এসে পৌঁছেন। একই দিনে বাংলাদেশের নিয়মিত বাহিনীর সর্বপ্রথম ইউনিট হিসাবে ২০-ইবি ঢাকার শীতলক্ষ্যার পূর্বপাড়ে মুড়াপাড়ায় পৌঁছে। পূর্ব দিকে ডেমরা ফেরির দিকে অগ্রসরমান ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানী প্রতিরোধের মুখে পড়ে। সমুদ্রপথে শত্রুদের পালানোর সুযোগ কমে যাওয়ায় ঢাকায় পাকিস্তানী হানাদারদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে।ঢাকা চূড়ান্ত লড়াইয়ের স্থল বলে চিহ্নিত হতে থাকায় সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও দ্রুত বাড়তে থাকে। ঢাকার আকাশ ভারতীয় বিমানবাহিনীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে থাকায় তারা পাকিস্তানী সামরিক অবস্থানের ওপর তীব্র আক্রমণ চালাতে থাকে। ঢাকার সর্বত্র অগণিত মুক্তিযোদ্ধা ও জনতা ছিল সুযোগের অপেক্ষায়। পাকিস্তানী সেনানায়কদের মনোবল উঁচু রাখার সামান্যতম অবলম্বন কোথাও ছিল না। তাদের একমাত্র ভরসা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ। কিন্তু এ কাজেও ব্যর্থ যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক বৃহৎ নৌযান ২৪ ঘণ্টা নিশ্চল রাখার পর এদিন সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরের দিকে এগুতে শুরু করে।একাত্তরে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর যতই এগিয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের বিজয় যেন ততই এগিয়ে আসতে থাকে। কিন্তু পরাজয় সুনিশ্চিত জেনে চরম নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতায় মেতে ওঠে হিংস্র পাক হানাদার বাহিনী। নবেম্বরের শেষ সপ্তাহের দিকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান জেনারেল নিয়াজি তাঁর রাজাকার, আলবদর ও সেনাবাহিনীকে দেশের চারদিকে ছড়িয়ে নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। কিন্তু তখনও হানাদার বাহিনী বুঝতে পারেনি তাদের পতন অত্যাসন্ন। একাত্তরের রক্ত-ক্ষরা এই দিনে গেরিলা আক্রমণ থেকে সম্মুখযুদ্ধের গতি বাড়ে। অপ্রতিরোধ্য বাঙালীর বিজয়রথে পাকবাহিনীর নিষ্ঠুর সব পরিকল্পনা ভেসত্মে যেতে থাকে। পরাজয়ের আভাস পেয়ে তৎকালীন পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এদিন মরিয়া হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে একটি চিঠি পাঠান।ইয়াহিয়া তাঁর চিঠিতে যুদ্ধকালীন সাহায্যের আশায় ১৯৫৯ সালের পাক-মার্কিন দ্বিপক্ষীয় চুক্তির এক অনুচ্ছেদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। সীমান্ত এলাকায় পাক জান্তারা সমরসজ্জা বৃদ্ধি করায় ভারতও তা মোকাবেলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়। ডিসেম্বরের প্রথম থেকেই ত্রিমুখী যুদ্ধের আশঙ্কা ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। এসব দেখেশুনে ভারত সরকার বুঝেছিল, পাকিস্তান যুদ্ধ করবেই। ভারত তখন যে রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা বা আশা একেবারে ছেড়ে দিয়েছে তা নয়। কিন্তু রাজনৈতিক সমাধানের সঙ্গে সঙ্গে ভারত সামরিক প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছিল। পশ্চিমের প্রস্তুতি দেখে এবং নাশকতামূলক কাজে লোক ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত মোটামুটি পরিষ্কার বুঝে ফেলে পাকিস্তান রাজনৈতিক সমাধানের দিকে যাবে না, বরং লড়াই-ই করবে। তাই তখন থেকে ভারতের প্রস্তুতিও জোরদার হয়েছিল।স্বাধীনতাপ্রিয় বাঙালী জাতি আজ নতুন আশায় বুক বেঁধেছে, ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতাকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে দীর্ঘ পথচলায় দুর্নীতি-অপশাসন ও স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির মতো হাজারও জঞ্জাল ভরে যাওয়া স্বপ্নের জাল ঝেড়ে পরিষ্কার করার সময় এসেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত প্রত্যাশিত রায় হয়েছে। একাত্তরের ক্ষতগুলোকে সারিয়ে তোলা বা রোধ করার এখনই সময়। অচিরেই যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি বিচারের মাধ্যমে নির্মূলে সরকার হয়ত সাহসী ভূমিকা নেবে, এমনটি দেখতেই এখন অধীর অপেক্ষা দেশের কোটি কোটি মানুষের।৫২ সালের ভাষা আন্দোলন যে পটভূমি রচিত করে দেয়, ৬৬ স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে টালমাটাল ৬৯ গণঅভ্যুত্থান পেরিয়ে এক প্রবল ঊর্মি হয়ে তা স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য ছিনিয়ে আনে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, বঞ্চনা আর হাহাকার একত্রিত হয়ে জন্ম দিয়েছিল এক ভয়াবহ যুদ্ধের। আর সেই যুদ্ধই নিয়ে আসে স্বাধীনতা। পৃথিবীর বুকে ওড়ে নতুন পতাকা, প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশ’ নামে নতুন একটি মানচিত্র। আর ডিসেম্বর মাস একদিকে যেমন বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত হওয়ার মাস, তেমনি স্বজন হারানোর শোকাচ্ছন্ন অনুভূতির মাসও। পুরো ডিসেম্বর মাস জুড়েই চলবে একাত্তরের শিহরণ জাগানো, রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময়তার স্মরণ অনুষ্ঠান। বিজয়ের মাসের প্রথম দিনটিকে স্মরণ করতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন নানা অনুষ্ঠান-কর্মসূচীর আয়োজন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, মানববন্ধন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক পোস্টার প্রদর্শনী ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা।

  • বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

Leave a reply

You must be logged in to post a comment.