প্রসঙ্গঃ ফাঁকাতন্ত্র —

Jan 17, 2012 at 5:50 am in ইসলাম ও জীবন by সম্পাদক

সামন্ততন্ত্র, রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ইত্যাদি নামে কয়েক প্রকার তন্ত্রের কথা জানি। এগুলোর পাশাপাশি ‘ফাঁকাতন্ত্র’ নামে আরেকটি তন্ত্র বিদ্যমান রয়েছে। বিবিধ কারণে এ তন্ত্র নিয়ে আলোচনা নেই বললেই চলে (এই নিবন্ধের লেখকের ‘ফাঁকাতন্ত্র’ শিরোনামে একটি গবেষণা গ্রন্থ লেখার ইচ্ছা রয়েছে)।- এ তন্ত্র প্রসঙ্গে কিছু বলার আগে জর্জ বার্নাড শ’র সেই বিখ্যাত উক্তি উল্লেখ করা প্রয়োজন, তা হলো- ‘‘যাদের ঈশ্বর আকাশে থাকে, তাদের থেকে সাবধান থেকো (Be aware of that whose God lives in the sky)”। আকাশ মানে ফাঁকাস্থান। এই ফাঁকাস্থান কেন্দ্রিক মতাদর্শ পৃথিবীতে বহু অনাচার-অবিচারের জন্ম দিয়েছে, এখনও বহু অঘটন ঘটাচ্ছে এবং এ তন্ত্রের কারণে না কি আগামীতে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। সামন্ততন্ত্র হলো ভূস্বামীদের তন্ত্র। ভূস্বামীদের আচার-অনুষ্ঠানের উপর ভিত্তি করে এ তন্ত্র পরিচালিত হয়। রাজতন্ত্রে রাজার ইচ্ছা-অনিচ্ছায় জনগণের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্রই সব। রাষ্ট্রকে জনগণের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার সুষম বন্টনের একমাত্র বিধাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে- জনগণকে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য করে যে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয় তাকে গণতন্ত্র বলে। উপরোক্ত তত্ত্বের আলোকে ফাঁকাতন্ত্র সম্পর্কে বলা যায়- ‘‘যে তন্ত্র ফাঁকা বিশ্বাসকে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য করে আবর্তিত হয় তাকে ফাঁকাতন্ত্র বলে’’।- সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ৫’শ কোটি বছর পূর্বে পৃথিবীর সৃষ্টি ঘটলেও মাত্র ২০ লাখ বছর পূর্বে মনূষ্য জীবের জন্ম ঘটেছে। তাঁরা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের উপর ভিত্তি করে আরও বলে থাকেন- ‘প্রচলিত ধর্মগুলোর অধিকাংশের উৎপত্তি ঘটেছে খ্রীষ্টপূর্ব ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫’শ সালের মধ্যে’।- ঐশীবাণী প্রধান ধর্মগুলোর মধ্যে খ্রীষ্টধর্মের অনুসারীরা সর্বপ্রথম রাজনীতিকে ধর্মের অধীনস্থ করেন। ধর্মে উল্লেখ আছে, ঈশ্বরের নির্দেশ অমান্য করায় মনূষ্য জীবকে প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়। পৃথিবী হলো পাপীদের স্থান। বিধায়, পাপীদের দ্বারা নির্বাচিত কোন প্রতিনিধি কিংবা তাদের রচিত কোন মতবাদ মনূষ্য জীবকে শুদ্ধ করতে পারে না। শুদ্ধতম রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতি পেতে হলে ধর্মের অধীনে থাকতে হবে। উৎপত্তি ঘটে এক তরবারি তত্ত্বের। বলা হয়- ঈশ্বর পরলোক ও ইহলোকের মুক্তির জন্য এক তরবারি দিয়ে যাজকদের প্রেরণ করেছেন। কিন্তু প্রগতির পিছনে থাকে সন্দেহ, অবিশ্বাস আর অস্বীকৃতির প্রবণতা। ফলে যাজকদের হাতে প্রগতিপন্থীরা নানাভাবে নিপীড়নের শিকার হতে থাকেন। এমন দূর্বিসহ অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে সৃষ্টি ঘটে রেঁনেসাসের (রেঁনেসার শাব্দিক অর্থ পুর্নজ্জীবন কিংবা নবজাগরণ। এর সংজ্ঞায় বলা আছে- চৌদ্দ, পনের ও ষোল শতকে ইউরোপ জুড়ে খ্রীষ্টপূর্ব গ্রীকের বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ও চিত্রকলার উপর ভিত্তি করে যে জাগরণের সৃষ্টি ঘটে তাই রেঁনেসা)।- ফলে রাজনীতিকে ধর্ম থেকে পৃথক করার বিষয়টি সামনে এসে যায়। কিন্তু বাস্তবে খ্রীষ্টপূর্ব জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে মধ্যযুগের ধর্মবাদের সমন্বয় ঘটতে দেখা যায়। সেসময় প্রতিবাদকারীরা (Protestant) বলা শুরু করেন- যাজকরা বাইবেলের ভূল ব্যাখ্যা দিয়ে ঈশ্বরকে উর্ধ্বাকাশে রেখে দিয়েছেন। আসলে ঈশ্বর রয়েছেন মনূষ্যলোকে। সকল সৃষ্টির মাঝে ঈশ্বর বিরাজমান রয়েছে। ঈশ্বরকে পেতে হলে তার সৃষ্টির কল্যাণ করতে হবে (জনৈক মিশনারী প্রধান বলেছেন- ‘আমি যখন একজন দুঃস্থকে সেবা করি, তখন মনে হয় স্বয়ং ঈশ্বরকেই সেবা করছি’)।- তাঁরা ঈশ্বর প্রাপ্তির আশায় এভাবে লক্ষ্য আর মাধ্যমের পরিবর্তন আনেন। সে সময় সৃষ্টি ঘটে দুই তরবারি তত্ত্বেরও। বলা হয়- যাজকের কাজ হলো পারলৌকিক জীবনের মুক্তি খোঁজা এবং রাজনীতিবিদদের কাজ হলো ইহলৌকিক সমস্যার সমাধান বের করা। সে হিসেবে রেঁনেসাসের অর্থ হওয়া উচিত ‘নবজাগরণ’।-সেসময় কিছু ধর্মের লোকেরা রেঁনেসাসকে অস্বীকার করে বলতে থাকেন- ‘তাদের ধর্মে লক্ষ্য এবং লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ উভয়ই নির্দিষ্ট করা আছে। তারাই কেবল বিশুদ্ধ ও শ্রেষ্ঠ ধর্মের অনুসারী। লক্ষ্য আর মাধ্যমের সামান্যতম সংস্কার বরদাশত করা হবে না ।’ এভাবে ফাঁকাতন্ত্রে আক্রামত্ম হয়ে এক ধর্মাবলম্বী আরেক ধর্মাবলম্বীদের নিশ্চি‎‎হৃ করে দেওয়ার হুমকিও দিচ্ছে মাঝে-মধ্যে । তাঁরা বিশ্বাসের আলোকে বাসত্মবতাকে বদলাতে না পেরে যুগে যুগে আহাজারী করে থাকে। তাঁরা ভুলে যান যে, ‘পরিবর্তন’ শব্দটি ছাড়া পৃথিবীর সবকিছুই পরিবর্তনশীল । মজার বিষয় হলো, তারা বিলম্বে হলেও জ্ঞান-বিজ্ঞানের আবিস্কারগুলো গ্রহণ করে থাকে। তবে রেঁনেসার প্রসঙ্গ উঠলেই তারা পূর্বের মতো বলে থাকেন- ‘পার্থিব জগৎ ক্ষণস্থায়ী। পারলৌকিক জীবন দীর্ঘস্থায়ী। প্রকৃত ঈশ্বর বিশ্বাসীরা কখনও পার্থিব জগৎকে জয়ের চিন্তায় মশগুল থাকতে পারে না’। -জনৈক অধ্যাপক এ প্রসঙ্গে বলেন-‘ মানুষ পৃথিবীত ফাঁকা হাতে আসে এবং ফাঁকা হাতে চলে যায় বটে; কিন্তু পৃথিবীতে সে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ারই চেষ্টা করে।’কোন কোন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মতে- ‘পৃথিবীতে মানুষ এসেছে পৃথিবীকে আনন্দময় কিংবা বিষাদময় করার ক্ষমতা নিয়েই।’ সেক্ষেত্রে বলা যায়- ‘তাদেরকে রেঁনেসা অথবা ধ্বংস যে কোন একটি পথ বেছে নিতে হবে’।- আমরা কি রেঁনেসা সৃষ্টির চেষ্টা করব, না ধ্বংসের জন্য অপেক্ষা করতে থাকবো, এটাই এখন প্রশ্ন। লেখকঃ গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রায়ন বিষয়ক গবেষক সেলঃ ০১৭১২-৬৩৮৬৮২

0 responses to প্রসঙ্গঃ ফাঁকাতন্ত্র —

Leave a reply

You must be logged in to post a comment.